Flickr

Sunday, 2 October 2011

বিদেশী আইনজীবীদের এত ভয় কেন?

বিদেশী আইনজীবীদের এত ভয় কেন?
 
আমার পাশের বাড়ির ভদ্রলোক আমার সাথে জমির সীমানা নির্ধারণের সময় অত্যন্ত ভদ্র ও নরম কণ্ঠে বলেছিলেন ‘‘আপনি আর আমি থাকলেই হবে অন্যলোকের কি দরকার’’ আমি সরল মনে তাকে ভদ্রলোক মনে করে একমত হলাম। পরে দেখি লোকটি চতুরতার সাথে আমার জমির মধ্যে বেশ খানিকটা ঢুকে গেছেন। অর্থাৎ আমার বেশ খানিকটা জায়গা হজম করে ফেলেছেন। আমার সরলতাকে দুর্বলতা ভেবে চতুরতার সাথেই কাজটি করেছেন। দুদিন পরেই এলাকার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি আমাকে বললেন, একি? আপনার জায়গায় উনি ঢুকে পড়েছেন। পরে অবশ্য আমার অংশ দখল পেয়েছি। কথাগুলো বললাম এজন্য যে, যারা সমাজ সচেতন এবং বিজ্ঞ ব্যক্তি তারা যদি ফয়সালা করেন তাহলে দুর্বল লোকেরা সঠিক বিচারটা পায়। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল তথা ক্ষমতায় চিরদিন থাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। তারা জানে সরকারের অন্যায় ও অনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম আর আন্দোলন কারা করতে পারে। এরশাদ সরকারের সময় জনাব এরশাদ বিদেশ সফরে যাওয়ার সময় বিমান বন্দরে সাংবাদিকগণ জিজ্ঞেস করেছিল আপনি বিরোধীদলের আন্দোলনকে ভয় পান কি না? উত্তরে জনাব এরশাদ বলেছিলেন ‘‘কেবল জামায়াতকে ভয় পাই’’। সত্যি কথাটাই বলেছিলেন সাবেক এ রাষ্ট্রপতি। জামায়াত যে কি জিনিস তিনি তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এ দেশবাসী জানে। জামায়াতের প্রশংসা করতে গিয়ে জনাব এরশাদ বলেন, ‘‘জামায়াত একটি সুশৃক্মখল দল। জনাব আববাস আলী খানের জানাযায় গিয়ে আমি দেখেছি, মাওলানা নিজামী যখন বললেন, আপনারা দুপা পিছনে যান অমনি সবাই পিছনে চলে গেলেন, মনে হল যেন কোন সেনাবাহিনীর কমান্ডার নির্দেশ দিচ্ছেন’’ কথাগুলো জনাব এরশাদ বলেছিলেন আল-ফালাহ মিলনায়তনে, আববাস আলী খান (র.) এর দোয়া অনুষ্ঠানে। উপরোক্ত কথাগুলো বললাম এজন্য যে, জনাব এরশাদ যে জামায়াতকে চিনেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি সে জামায়াতকে চিনতে পারেননি? চিনেছেন। আর চিনেছেন বলেই জামায়াতকে কোণঠাসা করে রেখে ক্ষমতায় থাকতে চান। এ দলের শীর্ষ নেতাদের উপর নির্যাতনের পর নির্যাতন করে যাচ্ছেন। জামায়াত নেতাদের সাথে আলোচনা করে দেখা গেছে তারা আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল, তাই তারা সবকিছুকেই আইনের মাধ্যমে এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে চান। এদেশের বর্তমান সরকারের সাজানো ট্রাইব্যুনালে যেন জুলুমের শিকার হতে না হয় সে জন্য তারা প্রয়োজনে বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন এটা তাদের যেমন মৌলিক অধিকার তেমনি বিচার আন্তর্জাতিক মানের হওয়ার জন্যেও জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের বিচার হবে আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষক থাকবেন না, আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী নিয়োগ দেয়া যাবে না, কেবল আমাদের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের মতো করে বিচার মঞ্চ তৈরি করবে তাই সবাইকে আন্তর্জাতিক মানের বিচার বলে মেনে নিতে হবে বিষয়টি কি এমনই? ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও চিটাগাং হিলট্রাক্টস কমিশনের কো-চেয়ারম্যান লর্ড এরিক অ্যাভেবুরি আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদকে বলেছেন, ‘‘যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে সম্পূর্ণরূপে অনীহা প্রকাশ করেছে। ট্রাইব্যুনাল যদি নিজেদের দেশীয় বিচার ব্যবস্থার একটি অঙ্গ মনে করেন তবে তাদের দেশীয় আইন মেনে চলা উচিত। আর যদি তারা এটাকে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল মনে করেন তাহলে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা উচিত। কিন্তু তারা এ দুটির একটির মধ্যেও নেই।’’ লর্ড এরিক আরো অনেক কথা বলেছেন, অনেক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। সমস্যা হলো আওয়ামী লীগ তো পারলে লর্ড এরিককে জামায়াতে ইসলামীর রুকন বানিয়ে ফেলবে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হয় দেশদ্রোহী, না হয় রাজাকার অথবা জঙ্গি কিংবা স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী। প্রশ্ন হলো, একজন আসামী তার আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবে না এটা কেমন জুলুম? লর্ড এরিক যথার্থই বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল যদি তাদেরকে দেশীয় আদালতের একটি অংশ মনে করে তাহলে দেশের আইন মানতে হবে আর যদি নিজেদেরকে আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনাল মনে করে তবে আন্তর্জাতিক আইন মানতে হবে। অথচ তারা কোনটার ধার ধারছে না। গায়ের জোরে আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকারে যেন কিছুই মানতে চাইছে না। বিদেশী আইনজীবীকে এতো ভয় কেন? তবে কি সরকারের সকল প্রকার বেআইনি তৎপরতা বিদেশীরা জেনে ফেলবে তাই? আজ না জানুক কাল জানবে কোন কিছু কি গোপন থাকার কথা? জামায়াতের মতো একটি দেশপ্রেমিক সুশৃক্মখল দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে এ আচরণ এর কি কোন প্রতিকার হবে না? দলটির প্রথিতযশা নেতারা আজ কারাগারে। আর তাদের পক্ষে বলিষ্ঠভাবে যদি কথা বলা হয় ঐ নেতাকেই টার্গেট করে সরকার কিভাবে তাকে দমানো যায়? হয় গাড়ি ভাঙ্গার মামলা অথবা গ্রেনেড হামলা কিংবা রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরে বাধাদান, আরো আছে পুলিশের কাজে বাধাদান, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া কত কি। শোনা যাচ্ছে, আগামীতে নাকি মোবাইল চুরি, সরকারের সমালোচনা, রাষ্ট্রপতির সমালোচনা ইত্যাদি কারণেও মামলা দেয়া হবে। জামায়াতের এক নেতা ডাঃ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের এক বক্তৃতায় সরকারের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। এতো ভয় যাদের ভিতর তারা সাঈদী-নিজামীর মতো মহান ব্যক্তিত্বের সাথে এ ন্যক্কারজনক আচরণ করে কি করে? তা অনেক বিশ্লেষকেরই নাকি বুঝে আসে না। এমন একটি দলের লাখ লাখ কর্মী বেঁচে থাকতে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর কিছু হবে আর তারা ঘরে বসে থাকবে বিষয়টা কি এমন? এ ধরনের কথাই মনে হয় ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছিলেন। এর অর্থ কি সরকারকে হুমকি দেয়া? এটা একটা সাধারণ কথা ‘‘যদি অন্যায়ভাবে নিজেদের ইচ্ছে মতো আইন শানিয়ে দেশের বরেণ্য আলেমদের ওপর কোন নির্যাতন চালানো হয় তাহলে জামায়াত-শিবিরের কয়েক লক্ষ নেতাকর্মী বসে থাকবে না।’’ এমন কথার অর্থইকি কাউকে মেরে ফেলার হুমকি? বাংলা ব্যাকরণ অধ্যয়ন করলে কি তাই অনুভব হয়? না এর অর্থ নেতার জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো। প্রয়োজনে নিজেদের জীবন ও সম্পদের সর্বোচ্চ কুরবানী দিবো এমনটি বুঝায়? আর জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের জন্য তো এটা খুবই স্বাভাবিক। যারা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আন্দোলন করে তাদের দ্বারা কোন অন্যায় তো প্রশ্নই আসে না তবে ন্যায়সঙ্গতভাবে তারা সব কিছু ত্যাগ করতে পারবে। অতএব আন্তর্জাতিক আইন মেনে আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনাল করে যেকোন অপরাধীদের বিচার করার ক্ষেত্রে জামায়াতের কোন আপত্তি নেই বলে তারা বলে যাচ্ছেন। সরকার কেন এদিকে যাচ্ছে না? আন্তর্জাতিক মান কি জামায়াতের পকেটে? বিশ্ববিবেক কি একচেটিয়া জামায়াতের দখলে? বিদেশীরা জামায়াতের বন্ধু আর সরকারের শত্রু? যদি নিরপেক্ষ ও ন্যায়বিচার সরকার চায় তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সমস্যা কোথায়? আর আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখলেই তো আসামী পক্ষকে প্রয়োজনে বিদেশী আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার সুযোগ দিতে হবে। সরকার কেন তা চাচ্ছে না ভয়টা কোথায়?
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের নেতাদের নির্যাতনে যত অর্থ ও সময় ব্যয় আর অপকৌশল চালিয়েছে তার কিঞ্চিৎ যদি দেশের জনগণের দুর্দশা লাঘবে ব্যয় করতো তাহলে দেশের জনগণের কত উপকার হতো। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, আইন-শৃক্মখলা, দ্রব্যমূল্যের পাগলাঘোড়া, চুরি, ডাকাতি, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, দুর্ঘটনা এগুলো এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যেন মানুষ আজ দিশেহারা অথচ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এমনভাবে কথা বলছে মনে হয় তারা জান্নাতের মধ্যে বসবাস করছে। করবেই তো কারণ তারা যে রঙিন চশমা পরে সবকিছু দেখে- সবুজ অথবা জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে বিরোধীদের সবকিছুতে দুর্গন্ধ অনুভব করে। সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃক্মখলা বজায় রাখার জন্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে অন্যথায় দেশের মধ্যে কোন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর দায়-দায়িত্ব কোনভাবেই সরকার এড়াতে পারবে না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণের মত। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে।

Tuesday, 12 July 2011

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ এবং বিতর্কিত বিচারক নিয়োগের প্রতিবাদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আহূত ‘গণ-অবস্থান' কর্মসূচি গত বুধবার ঢাকায় অভাবনীয় সাফল্যের সাথে সমাপ্ত হয়েছে। এ কর্মসূচি পালনের মধ্যদিয়ে বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে আর এটি বড় ধরনের রাজনৈতিক জাগরণ দৃশ্যমান হয়েছে। বিএনপি-র আহূত আসছে ২৭ জুন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা ঘোষিত হরতালের প্রতি জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোটের অংশীদার দলসমূহ এবং দেশের সকল জাতীয়তাবাদী ইসলামী শক্তিসমূহ ইতোমধ্যেই সমর্থন ব্যক্ত করেছে। হরতালের কর্মসূচি ঘোষণার সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছিলেন, এ কর্মসূচি সরকারের জন্য সতর্ক সংকেত। সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বিরোধী দলের আন্দোলনের কর্মসূচির প্রকৃতি ও প্রক্রিয়া কেমন হবে। হরতাল-পূর্ব কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত বুধবার ঢাকায় বিরোধী দল ও তার সহযোগী দলগুলো গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ উপলক্ষে সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেত্রী ঘোষণা করেছেন, সরকারের দিক থেকে আঘাত আসলে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
উল্লেখ্য, আসন্ন হরতালসহ বিরোধী দলের ভবিষ্যৎ আন্দোলন দুর্বল ও বানচাল করতেই সরকার সম্প্রতি ‘দৈনিক আমার দেশ' এর ডিক্লারেশন বাতিল করেছে, সম্পাদককে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশী রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং পত্রিকার বেশ কিছু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এদিকে সরকারি দল সংসদকে একটি একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলায় বিরোধী দল সংসদের বাইরে সাংবাদিক সম্মেলন করে একটি বিকল্প বাজেট পেশ করেছে। সরকারি দল একে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে একটি জনকল্যাণমুখী সমন্বিত বাজেট তৈরির সুযোগকে কাজে না লাগিয়ে রাজনৈতিক বাহাস শুরু করেছে। সরকারি দলের কোন কোন সংসদ সদস্য সংসদের বাইরে বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাজেটভাবনা পেশ করাকে সংবিধান লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছেন। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে এটাই শোভন ও শুদ্ধরীতি। কেননা মিডিয়া হচ্ছে জনগণের পার্লামেন্ট এবং মিডিয়া গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। সরকারি দল গণতান্ত্রিক সমাজে মিডিয়ার চিরন্তন ভূমিকা দেখতে চায় না বলেই অকার্যকর ও একদলীয় সংসদে গিয়ে বিরোধী দলকে বাজেট-ভাবনা পেশ করার ভাঁওতাবাজির আহবান জানাচ্ছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বিরোধী দলের বাজেট-প্রস্তাবনা পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে তাদের সুপারিশ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত বাজেট তৈরি করতে পারতো। কিন্তু দেশী-বিদেশী কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর সাথে সরকারের গাঁটছড়া বাঁধার কারণে তারা প্রস্তাবিত বাজেট প্যাকেট থেকে সরে এসে বিরোধী দলের সুপারিশকে আত্মস্থ করতে পারছে না।
এদিকে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ এবং বিতর্কিত বিচারক নিয়োগের প্রতিবাদে সম্মিলিত বিরোধী দলের গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সরকার বিচার বিভাগসহ বিচারিক প্রক্রিয়াকে দলীয়করণের কলংকজনক ইতিহাস তৈরিতে চ্যাম্পিয়ান হতে চলেছে। অতীতেও আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখন তারা বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপসহ সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ এবং সাংবাদিক নির্যাতনকে তাদের ফ্যাসীবাদী রাজনীতির অনুপান হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯৭৫-এর একদলীয় বাকশাল গঠন করে বিচারবিভাগকে কার্যত: দলের শাখা সংগঠনে পরিণত করা হয়েছিল। বিচার বিভাগের স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তাকে একদলীয় ফ্যাসীবাদী ক্ষমতার উদরে বিলীন করে দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা বিচারপতিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজপথে লাঠিমিছিল পর্যন্ত বের করেছিল। বস্তি উচ্ছেদ সংক্রান্ত হাইকোর্টের বিচারিক রায়ের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর নির্দেশনায় সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তি বসানোর মতো ঔদ্ধত্যও তারা দেখিয়েছিলেন। বিচার নিত্তিতে হাইকোর্টের বিচারকদের ‘বিব্রত' হবার ঘটনা নিয়ে তারা বিচারকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও হয়রানিমূলক কর্মসূচি নিয়েছে। আওয়ামী ঘরানার আইনজীবীদের উস্কানি দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে বিচারিক পরিবেশ বিঘ্নিত করা হয়। বিচারকদের জামিন দানের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপসহ তাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। দলীয় ফ্যাসীবাদী নৈরাজ্যের কাছে বিচার বিভাগকে নতি স্বীকার করতে আওয়ামী আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির কক্ষের ওপর লাথি মারাসহ অবমাননাকর কার্যক্রম চালিয়েছেন। এসব আইনজীবীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আদালতে মাস্তানী করা এসব আইনজীবী-বিচারবিভাগের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভূমিকা নিয়েও দলীয় বিবেচনায় শাস্তি বা মুচলেকা ছাড়াই মুক্তি পেয়েছেন।
এবারে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ মহাজোট ক্ষমতায় এসে বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ভয়ংকর থাবা বিস্তার করে। কার্যত: বিগত কেয়ারটেকার সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে বন্দুকের নলের মাথায় অশুভ কাজে এবং রাজনীতিক-ব্যবসায়িক-নাগরিকদের নির্যাতনে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার বিচার বিভাগকে তার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কাজে নগ্নভাবে ব্যবহার করে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের রেকর্ড অতিক্রম করেছে।
বর্তমান সরকার তার এটর্নী জেনারেলের অফিস এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিচারপতিদের ওপর প্রভাব বিস্তার ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে বিচার-প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। সরকারের পক্ষে এটর্নী জেনারেলের অফিসের আইনী প্রক্রিয়া ও আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে প্রকাশ্য এজলাশে হাইকোর্ট বন্ধ করে দেবার কথা বলেছেন। বিচার বিভাগের বর্তমান দুর্গতি দেখে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি দুঃখ করে বলেছেন: ‘‘বিচার বিভাগ কাচের ঘরে বন্দী হয়ে আছে।’’
এদিকে সরকার বিচার বিভাগকে ফ্যাসীবাদী রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে অযোগ্য, বিতর্কিত ও মামলার আসামীদেরও বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি উচ্চআদালত সরকারের প্রতি রুল জারী করে বিচারক নিয়োগের নীতিমালা সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের একটি ঐতিহাসিক রায়ের ভিত্তিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং বিচারবিভাগকে প্রশাসন তথা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসীবাদী আচরণে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হতে বসেছে। ম্যাজিস্ট্রেসী আদালতগুলোকেও মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী স্বাধীন ও বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোকে সরকার তার রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। মিথ্যা-বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলায় যাকে তাকে গ্রেফতার এবং দফায় দফায় রিমান্ড মঞ্জুর করে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সহায়তা করাই যেন নিম্নআদালতের ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ করা হচ্ছে যে, উচ্চআদালতের কোন নিয়ন্ত্রণ নিম্নআদালতে কার্যকর নেই। বরং সরকারই তার পুলিশী নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে ম্যাজিস্ট্রেসী আদালতগুলোকে ব্যবহার করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠেছে।
বিচারিক প্রক্রিয়াকে সরকার দলীয় বিবেচনায় কত নোংরাভাবে প্রভাবিত করছে, তার একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, বিগত সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের আমলে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক যেসব মামলায় সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জব্দ করা হয়েছিল, ঐসব মামলা থেকে বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রী-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো চালু রেখে সরকার দলীয় নেতা-নেত্রী-কর্মীদের প্রায় সকল মামলা ঢালাওভাবে ক্ষমতার জোরে তুলে নেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত তারা ১,৭৪৬টি মামলা প্রত্যাহার করে দিয়েছে, যার মধ্যে বিরোধীদলের মাত্র ২টি মামলা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সবকটি মামলা থেকে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু একই সময়ে ও প্রক্রিয়ায় দায়ের করা বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুরনো মামলা ছাড়াও নতুন নতুন মামলা দেয়া হচ্ছে। জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা সাজানোর পাঁয়তারা চলছে। বিচার প্রক্রিয়া ও বিচার বিভাগের ওপর সরকারের অব্যাহত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নাগরিকদের ন্যায়বিচার পাবার সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেবার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এটাই ফ্যাসীবাদী রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নমুনা। সরকারের এই হিংস্র ও নিপীড়নকারী-ফ্যাসীবাদী ভূমিকার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে একটি প্রবাহে, একই কেন্দ্রবিন্দুতে মিলিত হবার মধ্য দিয়েই বিচারবিভাগের স্বাধীনতাসহ নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
Hey, we've just launched a new custom color Blogger template. You'll like it - https://t.co/quGl87I2PZ
Join Our Newsletter